খন্দকার রুবাইয়ার নেতৃত্বে যশোরে কোটা সংস্কার আন্দোলনে নারী শিক্ষার্থীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই আন্দোলন শুধু কোটা ব্যবস্থার বৈষম্যের বিরুদ্ধেই রুখে দাঁড়ায়নি, বরং নারীদের রাজনৈতিক-সামাজিক সক্রিয়তায় একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
যেভাবে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল:
রুবাইয়া এবং তার সহযোদ্ধারা প্রথমে ক্যাম্পাসে ছোট ছোট বৈঠকের মাধ্যমে মতামত গঠন করেন, পরে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে (ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ) সংগঠিত হয়ে আন্দোলনকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেন। যদিও শুরুতে অংশগ্রহণ কম ছিল, কিন্তু সরকারের দমন-পীড়ন আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। বিশেষ করে রংপুরে আবু সাঈদের হত্যা এবং পুলিশের হিংস্রতা নারী শিক্ষার্থীদের ব্যাপকভাবে মাঠে নামতে উদ্বুদ্ধ করে।
নারীদের ভূমিকা:
যশোরে নারী শিক্ষার্থীরা শুধু মিছিলেই অংশ নেননি, তারা আন্দোলনের সামনের কাতারে থেকে লাঠিসোঁটা হাতে ছাত্রলীগ ও পুলিশের হামলা মোকাবিলা করেছেন। তাদের এই অংশগ্রহণ সমাজের প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে এবং প্রমাণ করে যে নারীরাও রাজপথে পরিবর্তনের লড়াইয়ে সমানভাবে সক্রিয় হতে পারেন। রুবাইয়ার ভাষায়, “মেয়েরা তাদের ভাইদের রক্ষায় ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
চ্যালেঞ্জ ও হুমকি:
আন্দোলনকারীদের উপর ছাত্রলীগ ও প্রশাসনের চাপ, হুমকি এবং নির্যাতন তীব্র হয়। নারী শিক্ষার্থীদের হোস্টেল ছেড়ে যেতে বাধ্য করা হয়, পরিবার থেকে বাধা আসে, এমনকি গুমের হুমকিও দেওয়া হয়। কিন্তু রুবাইয়াসহ অনেকেই এই চাপ উপেক্ষা করে আন্দোলন চালিয়ে যান।

আন্দোলনের প্রভাব ও বর্তমান অবস্থা:
জুলাই আন্দোলন শাসকগোষ্ঠীর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছিল, কিন্তু ৫ আগস্টের পর এর গতি কমে যায়। রুবাইয়া মনে করেন, নারীদের অবদান সঠিকভাবে মূল্যায়ন না করা হলেও এই আন্দোলন নারী জাগরণের একটি মাইলফলক। তিনি বিশ্বাস করেন, ফ্যাসিবাদ বিরোধী এই সংগ্রাম এখনও সম্পূর্ণ শেষ হয়নি, এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে আরও লড়াই প্রয়োজন।
খন্দকার রুবাইয়া এবং যশোরের নারী শিক্ষার্থীদের এই সংগ্রাম শুধু কোটা ব্যবস্থার বৈষম্যের বিরুদ্ধেই নয়, নারীর অধিকার ও সমতা প্রতিষ্ঠার লড়াইয়েও একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাদের সাহসী ভূমিকা প্রমাণ করে যে নারীরা পরিবর্তনের চালিকাশক্তি হতে পারেন, এবং এই আন্দোলন ভবিষ্যতের লড়াইয়ের জন্য একটি অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

[এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার]
ডিএনএ নিউজ: গত বছরের জুলাই মাসে কোটা সংস্কার আন্দোলন যখন সারা দেশে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে, যশোরে আপনি কিভাবে এই আন্দোলনের সূচনা করলেন?
খন্দকার রুবাইয়া: (দীর্ঘশ্বাস) ৪ জুলাই থেকে আমরা ক্যাম্পাসে গোপনে ছোট ছোট বৈঠক শুরু করি। ফেসবুক মেসেঞ্জার আর হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ তৈরি করে প্রথমে ২০-৩০ জন মেয়েকে সংগঠিত করি। ধীরে ধীরে সংখ্যা বাড়তে থাকে।
ডিএনএ নিউজ: নারী শিক্ষার্থীরা সাধারণত রাজনৈতিক আন্দোলনে এতটা সক্রিয় দেখা যায় না। কিন্তু এই আন্দোলনে তারা কিভাবে এগিয়ে এলো?
রুবাইয়া: (জোরালো কণ্ঠে) যখন পুলিশের লাঠিচার্জে আমাদের সহপাঠীরা রক্তাক্ত হচ্ছিল, যখন আবু সাঈদকে ব্লাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি করে হত্যা করা হলো – তখন আর পিছিয়ে থাকার উপায় ছিল না। মেয়েরা নিজেরাই লাঠি হাতে নিতে শুরু করলো।
ডিএনএ নিউজ: আন্দোলনের সময় সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত কোনটা ছিল?
রুবাইয়া: (কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে) ১৬ জুলাই। পুলিশ সুপারের অফিসের সামনে তারা আমাদের ওপর নির্মমভাবে লাঠিচার্জ করল। অনেক মেয়ে সহপাঠী গুরুতর আহত হয়েছিলেন। ওই দিনই প্রথম বুঝেছিলাম, রাষ্ট্রযন্ত্র কতটা নৃশংস হতে পারে।
ডিএনএ নিউজ: ছাত্রলীগ ও প্রশাসনের চাপ মোকাবেলা করলেন কিভাবে?
রুবাইয়া: (মৃদু হাসি) তারা আমাদের হোস্টেল খালি করতে বাধ্য করেছিল। আমার রুমমেটদের বাড়ি চলে যেতে বলা হয়েছিল। কিন্তু আমি একাই থেকে গিয়েছিলাম। পরে আবার সবাই ফিরে এসেছিলেন।
ডিএনএ নিউজ: এই আন্দোলন থেকে আপনি কী পেলেন?
রুবাইয়া: (গভীরভাবে) একটি অমূল্য শিক্ষা – যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে নারীরা একত্রিত হলে কোন শক্তি তাদের দাবিয়ে রাখতে পারে না। তবে দুঃখের বিষয়, আন্দোলন শেষে আমাদের অনেককেই বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে।
শেষ কথা:
“জুলাই আন্দোলন শুধু কোটা সংস্কারের লড়াই ছিল না, এটি ছিল নারীশক্তির জাগরণের এক অনন্য অধ্যায়” – খন্দকার রুবাইয়া
ডিএনএ নিউজ, যশোর ব্যুরো 










